দিনাজপুরের সাহিত্যচর্চার ইতিহাস — মোজাম্মেল বিশ্বাস

মূল বিষয়বস্তুতে যান
একই বিক্রেতার ৳২৯৯০ এর উপরে অর্ডারে ডেলিভারি ফ্রি · সারা বাংলাদেশে
IndoBangla
আজকের ছাড় এই বইয়ে — অফার শেষ হতে বাকি০০:০০:০০
দিনাজপুরের সাহিত্যচর্চার ইতিহাস
পছন্দের তালিকায় রাখুন

দিনাজপুরের সাহিত্যচর্চার ইতিহাস

লেখক: মোজাম্মেল বিশ্বাস || Mujammel Bishas
প্রকাশনী: Tangon Prokashon || টাঙ্গন প্রকাশন

নতুন এসেছে — প্রথম পাঠকদের একজন হোন।

৳১,২১০৳১,৩০০-%

সাশ্রয় ৳৯০

সব কর অন্তর্ভুক্ত · ১০০% আসল ভারতীয় সংস্করণ

ফ্রি ডেলিভারি

একই বিক্রেতার ৳২,৯৯০+ বই নিলে সারাদেশে ফ্রি

১০০% আসল বই
ক্যাশ অন ডেলিভারি
৩ দিনে রিটার্ন
ভারত থেকে আনা
দিনাজপুরের কথা উঠলেই কিছু প্রসঙ্গ আমাদের মানসপটে ভেসে ওঠে। রাজনীতিতে তেভাগা আন্দোলন; প্রত্নতত্ত্বে কান্তজী মন্দির, রামসাগর; সংস্কৃতিতে নাট্য সমিতি, নবরূপী; সাহিত্যে দিনাজপুর পত্রিকা ও নওরোজÑ আরও কত কী...

এক নজরে

এই বইয়ে যা পাবেন

Bengali
ভাষা
১st Published, ২০২৬
সংস্করণ
New
অবস্থা
Bangladesh
উৎস

বিবরণ

বইটি সম্পর্কে

দিনাজপুরের কথা উঠলেই কিছু প্রসঙ্গ আমাদের মানসপটে ভেসে ওঠে। রাজনীতিতে তেভাগা আন্দোলন; প্রত্নতত্ত্বে কান্তজী মন্দির, রামসাগর; সংস্কৃতিতে নাট্য সমিতি, নবরূপী; সাহিত্যে দিনাজপুর পত্রিকা ও নওরোজÑ আরও কত কী! প্রাচীনকাল থেকে আধুনিককাল পর্যন্ত শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে দিনাজপুর যে অবদান রচনা করেছে বাংলাদেশের শিল্প ও সংস্কৃতিকে তা দান করেছে শক্তিশালী ভিত্তি। বিশাল বাংলাজুড়ে যদি বাংলাদেশ হয় তাহলে শুধু রাজধানী কেন সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে? তা হয়তো এই কারণে যে, সারা দেশের শ্রেষ্ঠ বিদ্বজ্জন কেন্দ্রে এসে তাঁদের বিকাশের ক্ষেত্র খুঁজে পান। তাই বলে কি কেন্দ্রের বাইরে যারা জীবনভর সংস্কৃতি সাধনার মধ্য দিয়ে সত্য ও সৌন্দর্যের আরাধনা করেন তার কি কোনো মূল্য নেই? গোলাপের সৌন্দর্যে বিমোহিত হওয়া অপরাধ নয়; কিন্তু শেকড়ের কথা বাদ দিয়ে গোলাপের অস্তিত্ব কি কল্পনা করা সম্ভব? বাস্তবতা হচ্ছে শেকড়ের দিকে চোখ কম লোকেরই আছে। এজন্যই হয়তো আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক জগৎকে কখনও কখনও শেকড়হীন মনে হয়। মোজাম্মেল বিশ্বাস প্রণীত দিনাজপুরের সাহিত্যচর্চার ইতিহাস এই জিজ্ঞাসাসমূহ তুলে ধরেছে আমাদের সামনে। প্রথমেই প্রশ্ন জাগে, কেন তিনি এই বিপুলাকার গ্রন্থ প্রণয়নে হাত দিলেন? সহজ উত্তর যেÑতিনি সেই শেকড়ের সংবাদটি আমাদের দিতে চেয়েছেন। কী দিয়েছেন? এই জিজ্ঞাসার উত্তর দিতে বলতে হবে দিনাজপুরের জীবন ও সংস্কৃতির বৃৃত্তান্ত। প্রাচীনকাল থেকে এ সময় পর্যন্ত কত মানুষ কতভাবে সময়ের দোলাচলে, ঢেউয়ের ছন্দে দোলায়িত হয়েছেন, কখনো বিদ্রোহ-বিপ্লবে ফুঁসে উঠেছেন, কখনো প্রতিরোধ-প্রতিবাদে বলে যেতে চেয়েছেন নিজেদের কথা, দেশ-কাল-সমাজকে গড়ে নিতে চেয়েছেন আপন আপন স্বপ্ন ও প্রত্যাশার অনুকূলেÑ সেসব কথা তো সাহিত্যেরই অর্ঘ্য। প্রাচীনকালে উত্তরাঞ্চলের অন্যতম বিহার ছিল সোমপুর বিহার কিংবা সীতাকোট বিহার। চর্যাপদ-এর মাধ্যমে এসব বিহারে সাহিত্যচর্চার প্রমাণ মেলে। নাথধর্মের কাহিনি নিয়ে আঠারো শতকে কবি শুকুর মাহমুদ রচিত গুপিচন্দ্রের সন্ন্যাস দিনাজপুর থেকেই উদ্ধার করা হয়। আধুনিক যুগে দিনাজপুরের সাহিত্য-সাধনার নানা ঐতিহাসিক পর্ব লক্ষ করা যায়। উনিশ শতকের প্রথমার্ধে মিশনারিজ উইলিয়াম কেরীর মাধ্যমে শিক্ষা ও সংস্কৃতির জাগরণ ঘটতে থাকে। দিনাজপুরে নীলকুঠিতে চাকরির পাশাপাশি তিনি মিশনারি শিক্ষা প্রসারের সঙ্গে দিনাজপুরে প্রতিষ্ঠা করেন ব্যাপ্টিস্ট মিশন। দিনাজপুরে প্রবাসজীবনে (১৭৯৬-১৮০১) তাঁর অবদান ছিল অবিস্মরণীয়। রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রামও সাহিত্য-সংস্কৃতিকে প্রভাবিত করেছিল। রাজা বৈদ্যনাথের জমিদারিতে ফকির-সন্ন্যাসীদের অত্যাচার বেড়ে গিয়েছিল। স্থানীয় জমিদার দেবীসিংহ ও মধ্যস্বত্বভোগীদের অত্যাচারে ক্ষুব্ধ হয়ে নিরীহ কৃষকরা যে বিদ্রোহ করে তার প্রভাব পড়ে দিনাজপুরের সাহিত্যচর্চায়। রংপুর-দিনাজপুর অঞ্চলের লোককবি রতিরাম দাস রচিত জাগের গানে দেবী সিংহের চরিত্র ও তার নির্মম অত্যাচারের বিবরণ মেলে। এরকম অনেক ইতিহাস দিনাজপুরের সাহিত্যচর্চার ধারাকে সমৃদ্ধ করেছে। উনিশ শতকে বাংলায় যে জাগরণ দেখা দেয় তার ঢেউ পূর্ববঙ্গকে স্পর্শ করে এই শতকের শেষদিকে। এশিয়াটিক সোসাইটির মাধ্যমে আত্ম-অন্বেষার যে সূচনা ঘটেছিল বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ তাকে নিয়ে গিয়েছিল আরও এক ধাপ এগিয়ে। পূর্ববঙ্গের প্রায় সব জেলায় এর শাখা প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে মূলত আত্মজাগরণের কাজ চলছিল। এর অব্যবহিত পরে বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি সেই কাজটিকেই প্রসারতা দান করে। মূলত তখনি শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে নানামাত্রিক জাগরণ দেখা দেয়। সভা-সমিতি প্রতিষ্ঠা, পত্রিকা প্রকাশ, প্রতিষ্ঠান স্থাপন, মুদ্রাযন্ত্রের প্রবর্তন প্রভৃতির মাধ্যমে সমাজে জনমত প্রকাশ পেতে থাকে। মূলত এভাবেই ঔপনিবেশিককালে স্থবির, নিশ্চল ও অন্তর্মুখী সমাজে গতিশীলতা দেখা দেয়, জনজীবনে আসে প্রাণচাঞ্চল্য এবং উদ্দীপনা দেখা দেয় সর্বত্র। দিনাজপুরে ডায়মন্ড জুবিলি থিয়েটার কোম্পানি (১৮৮৫), সেন প্রেস (১৮৮৫), দিনাজপুর পত্রিকা (১৮৮৫-১৯৪৬), দিনাজপুর ইনস্টিটিউট (১৯০৪), আর্য্য পুস্তকাগার (১৯০৯), দিনাজপুর সাহিত্যসভা (১৯০৯), দিনাজপুর নাট্য সমিতি (১৯১৩), খাজা নাজিমউদ্দীন মুসলিম হল ও লাইব্রেরি (১৯৩৩), নওরোজ সাহিত্য মজলিস (১৯৫০), নওরোজ (১৯৪১), নবরূপী (১৯৬৩), দিনাজপুর মিউজিয়াম (১৯৬৮) প্রভৃতি প্রতিষ্ঠান-সংস্থা-পত্রিকা সাংস্কৃতিক জাগরণে ঐতিহাসিক অবদান রেখেছিল। এইসব প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রও প্রসারিত হয়েছিল সমানভাবে। আধুনিক যুগে এই সব প্রতিষ্ঠান ও পত্রিকাকে ঘিরে সাহিত্যিকগণ সাহিত্যসাধনার বলয় গড়ে তুলেছিলেন। তখন রাজধানী বা কেন্দ্রীয় নানা উদ্যোগ ও প্রয়াসের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বা প্রভাবে দিনাজপুরের নানা বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা অগ্রসর হয়েছিল। বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের শাখারূপে গড়ে উঠেছিল রঙ্গপুর সাহিত্য পরিষৎ (১৯০৫-১৯৪১)। তারই একটি শাখা উত্তরবঙ্গ সাহিত্য সম্মিলন। দিনাজপুরসহ উত্তরবঙ্গ ও আসামের জেলা শহরে ১৯০৮ থেকে ১৯১৭ সাল পর্যন্ত উত্তরবঙ্গ সাহিত্য সম্মিলনের পরপর দশটি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ১৯১৩ সালে ষষ্ঠ সম্মিলন অনুষ্ঠিত হয় দিনাজপুরে। রঙ্গপুর সাহিত্য পরিষদের শাখা হিসেবে উত্তরবঙ্গের লেখক, গবেষক, ঐতিহাসিক ও প্রত্নতত্ত্ববিদদের নিয়ে উক্ত সম্মিলন অনুষ্ঠিত হতো। তাদের উদ্দেশ্য ছিল উত্তরবঙ্গ ও আসামের জেলাসমূহের প্রাচীন পু্ঁিথ, পুরাকীর্তি, ঐতিহাসিক নিদর্শন, প্রাচীন মূর্তি, মুদ্রা প্রভৃতি আবিষ্কার ও প্রদর্শন করা। এসব কর্মকাণ্ড ছিল বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণের অনন্য পর্ব এবং আত্ম-অন্বেষার হাজারদুয়ারি প্রয়াস। অর্থাৎ উপর্যুক্ত সংগঠনসমূহ স্ব স্ব ভূমিকার মাধ্যমে মূলত সাংস্কৃতিক জাগরণের কাজটি করে যাচ্ছিল। কেন্দ্রের সঙ্গে স্থানিক এই সম্পর্ক স্থানীয় বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চাকে নিঃসন্দেহে প্রণোদিত ও বিকশিত করেছিল। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর বিরাট এক সাংস্কৃতিক ভাঙন দেখা দেয়। সেই নাজুক পরিস্থিতির সঙ্গে পুনর্গঠনের শক্তিও সমাজে সমানভাবে ক্রিয়াশীল ছিল। পুরো পাকিস্তান পর্বে এর নানা বৈশিষ্ট্য ও লক্ষণ বিশেষভাবে পরিদৃষ্ট হয়। মুসলিম-মানস যেভাবে বিকশিত হচ্ছিল তারাই সেই পুনর্গঠনে এগিয়ে আসে। সেক্ষেত্রে বড় ভূমিকা পালন করে খাজা নাজিমউদ্দীন মুসলিম হল ও পাবলিক লাইব্রেরি। এই লাইব্রেরির (১৯৩৩) মুখপত্র ছিল নওরোজ (১৯৪১)। নওরোজকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে নওরোজ সাহিত্য মজলিস (১৯৫০)। দিনাজপুরের লেখকগণ এই পত্রিকাকে কেন্দ্র করে তাদের সাহিত্যসাধনা বিকশিত করেছেন। নওরোজের প্রথম বার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৫১ সালে। মুক্তিযুদ্ধের পূর্ব পর্যন্ত প্রায় প্রতিবছরই নওরোজ সাহিত্য সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এসব সম্মেলনে যোগদান করেছেন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্, ড. মুহম্মদ এনামুল হক, কবি জসীমউদ্দীন, কবি গোলাম মোস্তফা, কবি সুফিয়া কামাল, অধ্যক্ষ ইব্রাহীম খাঁ, কবি আবদুল কাদির, সৈয়দ আলী আহসান প্রমুখ। ১৯৫৫ সালের সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ যে ভাষণ দেন তাতে বাংলা একাডেমি প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তার কথা বিশেষভাবে আলোচনা করেন, যা ঐতিহাসিক গুরুত্ব বহন করে। নওরোজকে ঘিরে সাহিত্য মজলিস থেকে নানা ধরনের জাগরণী কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়েছিল। পাঠাগারটিতে অনেক হস্তলিখিত আরবি-ফারসি, সংস্কৃত-উর্দু ভাষার পাণ্ডুলিপি, তালপাতা ও তুলট কাগজে লেখা, দুষ্প্রাপ্য গ্রন্থ, শিলালিপি প্রভৃতি সংরক্ষিত ছিল। উত্তরবঙ্গ সাহিত্য সম্মিলনের উদ্দেশ্যের প্রভাব এখানে বিশেষভাবে লক্ষযোগ্য। মূলত এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যাঁরা যুক্ত ছিলেন তাঁদের আন্তরিক সহযোগে গড়ে ওঠে দিনাজপুর মিউজিয়াম (১৯৬৮)। ১৯৬৮ সালে জেলা প্রশাসক আ ক ম যাকারিয়া ও মেহরাব আলীর (১৯২৫-২০০৮) প্রচেষ্টায় দিনাজপুর জাদুঘর প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ শুরু হলে হেমায়েত আলী তাতে সহযোগিতা করেন। সে সময়ে নাট্যচর্চার ধারাকে প্রাণবন্ত রেখেছিল নবরূপী (১৯৬৩)। পাকিস্তান আমলে ইসলামী সাহিত্য মজলিসের উদ্যোগে কয়েকবার বার্ষিক সম্মেলনও অনুষ্ঠিত হয়। সাহিত্যচর্চার ধারাকে মুক্তিযুদ্ধ দিয়েছিল ভিন্ন মাত্রা। স্বাধীনতা-উত্তরকালে উপর্যুক্ত ধারা ঠিক সেইভাবে প্রবহমান না থাকলেও নতুনভাবে তা বিকশিত হয়েছিল। সেক্ষেত্রে প্রয়াসী সাহিত্য সংকলন নানাভাবে গুরুত্ববহ। উত্তরতরঙ্গ সাহিত্য পরিষদ (১৯৮৭-১৯৯৭) দিনাজপুরে পালন করে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা। তবে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তির বিষাক্ত নখর যেভাবে সারা দেশকে রক্তাক্ত করেছিল তেমনি আর্য্য পুস্তকাগারের প্রকাশনা অফিস বর্বর পাকিস্তানি বাহিনী কর্তৃক বোমার আঘাতে ভস্মীভূত হয়। সম্ভবত তারই প্রতীকী প্রতিবাদ প্রয়াসী। এই যে এতক্ষণ দিনাজপুরের সাহিত্য-সংস্কৃতির রূপরেখা বর্ণিত হলো তারই মাঝেই মোজাম্মেল বিশ্বাস খুঁজে নিতে চেয়েছেন বিদ্বৎসাধনার পূর্বাপর বৃত্তান্ত। প্রথমেই লক্ষণীয় যে, সাহিত্যচর্চাকে লেখক দেখেছেন প্রসারিত দৃষ্টিকোণ থেকে। এজন্যই তিনি বহুকৌণিক ভঙ্গিতে গ্রন্থের বিষয়বস্তুকে তুলে ধরার প্রয়াস নিয়েছেন। এক্ষেত্রে বড় প্রতিবন্ধক যথাযথ পদ্ধতি ও প্রণালি গ্রহণ করা। যখন দিনাজপুরের সাহিত্যচর্চার কথা বলা হচ্ছে তখন আমরা কী বুঝি? দিনাজপুরে বসে বা এই ভৌগোলিক সীমারেখায় সাহিত্যচর্চা, নাকি এই অঞ্চলের মানুষ যারা এখানে বা দূরে বসে সাহিত্যচর্চা করছেন তার ইতিবৃত্ত? অধিকাংশ স্থানীয় ইতিহাসের ক্ষেত্রে এ প্রসঙ্গে বিভ্রান্তি হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু বর্তমান গ্রন্থে বিষয়টি অনেকটাই উতরে গিয়েছে। অনেকটা অভিসন্দর্ভশৈলীতে প্রণীত এই গ্রন্থে ১৪টি অধ্যায়ে বিষয়বস্তু বর্ণিত হয়েছে। প্রাচীন যুগ, মধ্যযুগ, আধুনিক যুগ, দেশভাগোত্তর, মুক্তিযুদ্ধোত্তর, সাম্প্রতিকÑ এই কয়েকভাগে বিস্তৃত বর্ণনার পর লেখক অগ্রসর হয়েছেন বিষয়ভিত্তিক আলোচনায়। যেমনÑ নাট্যচর্চা, সাংগঠনিক সাহিত্যচর্চা, সাময়িকপত্রে সাহিত্যচর্চা, গবেষণা সাহিত্যচর্চা, উপজেলাভিত্তিক সাহিত্যচর্চা, সাহিত্য সম্মেলন, প্রাতিষ্ঠানিক সাহিত্যচর্চা প্রভৃতি। মূলত প্রাচীনকাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত যারা সাহিত্যের নানাবিধ ক্ষেত্রে সৃজনকর্মে ব্যাপৃত ছিলেন তাঁদের জীবন ও সৃষ্টিকর্মের পরিচয় এই গ্রন্থের মূল উপজীব্য। প্রত্যেকটি অধ্যায়েই লেখকভিত্তিক আলোচনার পূর্বে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সাধারণ আলোচনা বিবৃত হয়েছে। সাহিত্যসাধক নির্বাচনে গবেষক বিশেষ বাছবিচার করেননি। যারাই ভূমিকা রেখেছেন তাদের কথাই তুলে এনেছেন। অনেক সাহিত্যিকের জীবন ও সৃষ্টিকর্মের কথা জানা যায়, যাদের কথা হয়তো সাধারণত উঠে আসতো না বা একসময় হারিয়ে যেতো। ইতিহাসের স্বার্থেই এসব তথ্য সংকলিত হয়েছে। এভাবে গ্রন্থটি হয়ে উঠেছে অনেকটা দিনাজপুরে বুদ্ধিবৃত্তিক অভিজ্ঞানের অভিধান। মূলত কেন্দ্র থেকে বহু দূরে কারা কীভাবে কী সাহিত্যসাধনা করেছেন তারই পরিচয় ফুটে উঠেছে গ্রন্থটির পরতে পরতে। সেই সব সাহিত্যিকের কারো কারো লেখা হয়তো ক্ষেত্র বিশেষে কালোত্তীর্ণ হয়ে উঠেনি, পার হয়নি মানোত্তীর্ণের চৌকাঠ, তাতে কী? তারা যে কাজটি করে গিয়েছেন তার তো মূল্য আছে। মূলত এই মহতী বোধ লেখককে উদ্ধুদ্ধ করেছে সাহিত্যচর্চার এই সব বৃত্তান্ত সংগ্রহ ও উপস্থাপনে। তবে এই সাহিত্যসাধনার ভুবনে শুধু যে লেখকরা চরিত্রের মর্যাদা লাভ করেছেন তা নয়। কোনো কোনো পত্রিকা, সাহিত্য সমিতি, প্রতিষ্ঠান, সংস্থাও অনন্য চরিত্রের মর্যাদা লাভ করেছে। অর্থাৎ সেইসব পত্রিকা, সাহিত্য সংগঠন, সংস্থা কী করে সাহিত্যচর্চাকে অগ্রগতি দান করেছিল কিংবা সাহিত্যচর্চায় মুক্তপ্রান্তর সৃজন করছিল সেকথা বিধৃত হয়েছে বিশদরূপে। যেমন দিনাজপুর পত্রিকা ১৮৮৫-১৯৪৬ পর্যন্ত যে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিল তা সাহিত্যের চরিত্র হিসেবে দাঁড়িয়ে যায়। এ প্রসঙ্গে লেখকের পর্যবেক্ষণ, পত্রিকাটি দিনাজপুরের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ঐতিহ্যের পটভূমিতে ছিল অনন্য তথ্যভাণ্ডার। নওরোজ পত্রিকার ক্ষেত্রেও একই কথা খাটে, সেখানে পুরো পাকিস্তান আমলে যে বার্ষিক সম্মেলন হয়েছে, তার বিবরণ-ভাষ্য অনন্য চারিত্র্য মর্যাদা অর্জন করেছে। এজন্য শুধু সাহিত্যচর্চার সাধারণ বর্ণনার মধ্যে এই গ্রন্থের গুরুত্ব সীমাবদ্ধ থাকেনি। পুরো দিনাজপুর জেলার বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্য ও অহংকারের চিত্র পাওয়া যায় গ্রন্থের প্রতিটি পর্বে। এক কথায় বলতে গেলেÑ গ্রন্থটি মূল্যবান সব তথ্যসমৃদ্ধ দিনাজপুরের বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণের অসামান্য দলিল। বিশেষ পরিকল্পনা করে লেখক গ্রন্থটি রচনা শুরু করেছেন তা হয়তো নয়। গ্রন্থটির অনেকটাই বিবরণধর্মী, বিশ্লেষণ বিশেষ দুর্লভ। তবে পত্রিকা, সংগঠন, ব্যক্তি, সংস্থা প্রভৃতির পরিচয় লেখক তুলে ধরেছেন সযত্নে। ক্ষেত্র বিশেষে হয়তো অপরাপর সংগঠনের তুলনায় কোনো কোনো সংস্থার পরিচয় বেশি পরিসর পেয়েছে, তবে তা অপ্রাসঙ্গিকতার মাত্রা ছাপিয়ে যায়নি। সেক্ষেত্রে হয়তো বর্ণনা কিছুটা সংক্ষিপ্ত হতে পারতো। তবে কোথাও ধান ভানতে শিবের গীত শোনা যায়নি। গ্রন্থে ব্যতিক্রমধর্মী প্রবণতাও রয়েছে। যেমন স্কুল ও কলেজ থেকে যে সাহিত্যপত্র বের হয় অধিকাংশ সময়ে সাহিত্য-আলোচনায় স্থান পায় না। বর্তমান গ্রন্থে লেখক প্রাতিষ্ঠানিক সাহিত্যচর্চা অধ্যায়ে সেই বিষয়ে বিস্তৃতরূপে আলোচনা করেছেন। পুরোনো সেসব সাহিত্যপত্র মূল্যবান দলিল হিসেবে বিবেচ্য। মোজাম্মেল বিশ্বাস সাহিত্যের সঙ্গে সময় ও সমাজের মেলবন্ধন ঘটাতে চেয়েছেন, অন্য অর্থে খুঁজতে চেয়েছেন ইতিহাস ও সাহিত্যের সম্পর্ক-সূত্র। কয়েকটি দৃষ্টান্ত থেকে বিষয়টি স্পষ্ট হতে পারে। সন্ধ্যাকর নন্দীর রামচরিতম কাব্যগ্রন্থে কৈবর্ত বিদ্রোহের ইতিহাস পাওয়া যায়। কবি সমসাময়িক ঘটনার প্রত্যক্ষ বর্ণনা তুলে ধরেছেন, যার ঐতিহাসিক মূল্য বিদ্যমান। নীলচাষিরা তাদের উপরে অমানুষিক নির্যাতনের প্রতিবাদে অনেক গান বেঁধেছিল। একটি গানের ভাবার্থ এমন : ‘নীলকর সাহেবের আগাম টাকায় সুদ জমে তিন পুরুষ ধরে।/সাহেব যখন প্রথম আসেÑসে আসে ভিখিরীর মতো/কিন্তু শেষে তারি কল্যাণে দূর্বা গজায় রায়তের হাড়ে।’ লেখক এসব বিষয় তুলে ধরেছেন ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। গবেষকের সমাজচেতনাও এখানে প্রণিধানযোগ্য। তিনি সাহিত্যকে বিশ্লেষণ করেছেন সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে। এজন্য সাহিত্যচর্চা প্রসঙ্গে তিনি বহু সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গের অবতারণা করেন, সেখানে প্রবেশ করাতে চান সামাজিক প্রত্যয়কে, যে প্রত্যয় সমাজ পরিবর্তনের ইশারা দেয়। এই দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিমূল তার ইতিহাসচেতনা। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসচর্চা তার এই চেতনা নির্মাণের পটভূমি। এই গ্রন্থের পাণ্ডুলিপি পাঠে অনেক মহৎপ্রাণের সঙ্গে পরিচয় ঘটে, যাঁরা একান্তভাবে সংস্কৃতিকে জীবনের আনন্দ হিসেবে গ্রহণ করে, যুগের দায় কাঁধে নিয়ে নানামুখী কর্মপ্রয়াস গ্রহণ করেছিলেন। তাদের মধ্যে ব্রজেশ্বর সিংহ ও হরিচরণ সেনের কথা এ মুহূর্তে মনে পড়ছে। কী ছিল তাদের জীবনসাধনা? স্বদেশমাতৃকার প্রতি শ্রদ্ধা ও সহানুভূতি জাগিয়ে তুলতে ১৮৮৫ সালে মাসিক দিনাজপুর পত্রিকা আত্মপ্রকাশ করে, যার প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন ব্রজেশ্বর সিংহ। তিনি ছিলেন স্বদেশি আন্দোলনের নেতা। তাঁর মতো বহু দেশহিতৈষী পূর্ববঙ্গের জেলায় জেলায় জাতীয় দায় গ্রহণ করে পত্রিকা প্রকাশ করেছেনÑ সর্বোপরি সৃষ্টি করেছেন সামাজিক জাগরণ। এ সময় দিনাজপুরে শিল্প-সংস্কৃতি, সাহিত্য ও ইতিহাসচর্চা প্রভৃতির মাধ্যমে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন নবতরঙ্গ তুলে। উনিশ শতকের শেষপ্রান্তে দিনাজপুর রাজবাড়িতে কোহিনূর থিয়েটারের (১৮৭৯) মঞ্চনাট্যচর্চা দিনাজপুরকে আন্দোলিত করে। দিনাজপুর জেলায় বিনোদন বলতে ছিল রাজবাড়িকেন্দ্রিক কৃষ্ণযাত্রা, কবিগান ও পাঁচালি। সাধারণ মানুষের সেখানে প্রবেশাধিকার ছিল না। হরিচরণ সেন আধুনিক নাট্যাভিনয়ের সূত্রপাত করে জনসমাজে তাকে বিকশিত করেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত ডায়মন্ড জুবিলী থিয়েটার কোম্পানি (১৮৮৫-১৯০৪) জনমানুষের সঙ্গে সম্পৃক্তি ঘটিয়েছিল। জমিদারনন্দন হরিচরণ নাটককে জীবনের সৎকর্ম হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। তিনি সংস্কৃতিকে রাজদরবার থেকে মুক্তি দিয়ে নিয়ে এসেছিলেন সাধারণ মানুষের কাছে। চারণকবি আমিরুদ্দিন সরকার কবিগানের সরকার হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিনি প্রায় ১০০ পুস্তিকার রচয়িতা। দিনাজপুরের অসংখ্য সভা-সমিতি, অনুষ্ঠান, হাটবাজার ও রাস্তাঘাটে তাঁর কবিতা প্রচার হতো। সেই বিস্মৃত চারণকবিকে খুঁজে পাওয়া যায় বর্তমান গ্রন্থে। তাছাড়া আমরা কি ভুলে যাবো শাহজাহান শাহ্র কথা? কী অসাধারণ ত্যাগের মহিমায় তিনি সাংস্কৃতিক আন্দোলনে, বিশেষত নাটক ও নাট্যচর্চাকে জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। এভাবে আরও অনেক মহৎপ্রাণের জীবনসাধনা আমাদের মনে রেখাপাত করে। গ্রন্থে সাহিত্য-সংগঠন, সাহিত্য ও সাময়িকপত্রের পরিচয়ও উঠে এসেছে নানাভাবে। রয়েছে গবেষণা সাহিত্যের বিবরণও। শুধু বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণ নয় এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এই জনপদের সমাজ, সংস্কৃতি ও রাজনীতির ক্রমবিকাশ। শহর ছাড়িয়ে প্রান্তিক পর্যায়েও কী করে সাহিত্যচর্চা অব্যাহত থেকেছে তাও লেখক তুলে ধরেছেন সযত্নে। কত যে প্রসঙ্গের অবতারণা ঘটেছে তার ইয়ত্তা নেই। লেখকের সূক্ষ্ম ও কৌতূহলী চোখ কোনো কিছুই এড়িয়ে যায়নি। কত মানুষ কতভাবে উঁকি দিয়েছে প্রসঙ্গ থেকে প্রসঙ্গান্তরেÑ কতজনের কত কাজ উল্লেখিত হয়েছে তা ভাবতেই বিস্ময় জাগে। মনে হয় যোগীবাড়ির হাজী মোহাম্মদ দানেশ হাজির হয়েছেন তাঁর পিতা হেদায়েতুল্লাহ মোল্লা (১৮৩৩-১৮৭৯) রচিত হজব্রতের স্মৃতি মফিদল হোজ্জাজ (১৮৭৭) শীর্ষক পুঁথিহাতে; উঁকি দিয়ে গিয়েছেন স্বর্গ ও নরক-এর অমর কবি শেখ ফজলল করিম, যিনি মুসলিম মঙ্গল পাঠাগার-এর নামকরণ করেছিলেন, পৃষ্ঠপোষকতার আশায় যার পরিবর্তিত নাম হয়েছিল নাজিমউদ্দীন হল ও পাঠাগার; শিশুসাহিত্যিক কাজী কাদের নওয়াজ গুনগুনিয়ে পাঠ করে চলেছেন তাঁর অমর কবিতা শিক্ষাগুরুর মর্যাদা; মুক্তিযুদ্ধে শহিদ সাংবাদিক আ ন ম গোলাম মোস্তফা বলে চলছেন শ্রেণিসংগ্রাম ও শোষণমুক্তির কথা। রয়েছেন আরও ‘কত জ্ঞানীগুণী কত মহাজন’। এই গ্রন্থের গুরুত্ব এখানে যে, সাহিত্যসাধনা প্রসঙ্গে বহু অমূল্য তথ্য সংগৃহীত হয়েছে, বহু বিক্ষিপ্ত তথ্য একত্র হওয়ার প্রয়াস পেয়েছে। বহু অনালোকিত তথ্য জড়ো হয়ে সৃষ্টি করেছে বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাস। শেষ পর্যন্ত কী পাওয়া যায় এই গ্রন্থে? পাওয়া যায় সংস্কৃতির অমিয়ধারা। মানুষের সুখ-দুঃখের কথা স্থানীয় লেখক যেভাবে তুলে ধরেছেন গল্প, কবিতা, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ ও গবেষণার মাধ্যমে মূলত তারই বয়ান এই গ্রন্থ। বাঙালির মুক্তির কথাই শেষ পর্যন্ত ধ্বনিত হয়েছে। ‘সবার উপরে মানুষ সত্য’Ñ এই বাণীই যেন এই সাহিত্যসাধনার মূল সুর। কেন্দ্রের বহু দূরবর্তী অঞ্চলে রাজনৈতিক আন্দোলন, সামাজিক প্রতিক্রিয়া ও সাংস্কৃতিক জাগরণে সাড়া দিয়ে তারা যেভাবে সাহিত্যসাধনা করেছেন তারই বিশ্বস্ত ভাষ্য বর্তমান গ্রন্থ। এই গ্রন্থে দিনাজপুরের মানসশক্তির পরিচয় পাওয়া যায় কয়েকটি সূত্রে। প্রথমত, মুক্তিযুদ্ধে গণহত্যা-বধ্যভূমিবিষয়ক প্রশিক্ষণ কর্মযজ্ঞে। দুই পর্বে সেখানে শিক্ষক, সাংবাদিক, সংস্কৃতিকর্মী, সরকারি কর্মকর্তা, লেখক, গবেষক প্রমুখের অংশগ্রহণে সেই প্রশিক্ষণ ছিল দারুণ ফলপ্রসূ। দ্বিতীয়ত, দিনাজপুর মিউজিয়াম পরিদর্শনকালে জাদুঘরে প্রদর্শিত মুক্তিযুদ্ধের স্মারক-সংগ্রহ দেখে ঢাকার কয়েকজন সুধীজনের মনে ভ্রƒণ সঞ্চার ঘটে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক জাদুঘর প্রতিষ্ঠার। তারই পরিপূর্ণ রূপ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর (১৯৯৬)। মূলত বর্তমান গ্রন্থটি সেই মানসশক্তিরই প্রত্যক্ষ ফসল। বাংলা ও বাঙালিমুখী এই চেতনাধারার পূর্ণপ্রবাহ আরও স্বচ্ছ হয়ে ওঠে যখন ‘নাজিমউদ্দীন হল ও পাঠাগার-এর নাম তার প্রতিষ্ঠাতার স্মরণে পরিবর্তিত হয়ে যথোচিত রূপ পায় হেমায়েত আলী পাবলিক লাইব্রেরি নামে। মোজাম্মেল বিশ্বাস যখন দিনাজপুর মিউজিয়াম দেখাচ্ছিলেন তখন এর বিপুল মানসসম্পদের পরিচয় পেয়েছিলাম। এই প্রতিষ্ঠান তো বটেই উপরিউক্ত অন্য দুটি কর্মপ্রয়াসের সঙ্গে তাঁর গভীর সম্পৃক্তি থেকে বোঝা যায় গভীর আদর্শিক প্রত্যয় নিয়ে তিনি নিবেদিত আছেন বাঙালির আত্মপরিচয় উন্মোচনের সংগ্রামে। বর্তমান গ্রন্থটির মর্মার্থ অনুধাবনে আর কোনো ইশারার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। এই লেখার মধ্যে দুইজন মনীষীকে স্মরণ না করলে অকৃতজ্ঞতার কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবেÑ তাঁরা হলেন হেমায়েত আলী ও মেহরাব আলী। নাজিমউদ্দীন হল ও পাঠাগার প্রতিষ্ঠা, নওরোজ পত্রিকা প্রকাশ, সাহিত্য মজলিস, বার্ষিক সাহিত্য সম্মেলন প্রভৃতি কাজে হেমায়েত আলীর ভূমিকা ছিল অনবদ্য। অন্যদিকে স্থানীয় সাহিত্য-সংস্কৃতি তথা বহুমাত্রিক ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে একলব্যের ভূমিকা পালন করেছিলেন মেহরাব আলী। মোজাম্মেল বিশ্বাসের ওপর এই দুই মনীষীর ছায়া সুস্পষ্টভাবে লক্ষ্যযোগ্য। যেন তাঁদের অসমাপ্ত কাজই সম্পন্ন করছেন তিনি। বর্তমান গ্রন্থের নানাপ্রসঙ্গে তাঁদের কর্মসাধনার মূল্যায়ন উঠে এসেছে। আরেকজনের কথাও বিশেষভাবে স্মরণীয়। তিনি উইলিয়াম কেরী। তিনি যে ডায়াসে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা করতেন দিনাজপুর ব্যাপ্টিস্ট মিশনে সেটি দেখে আপ্লুত হয়েছিলাম। বর্তমান গ্রন্থে আধুনিক দিনাজপুর প্রতিষ্ঠা প্রসঙ্গে কেরীর অমর কীর্তি বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে। আমাদের বিদ্যাচর্চায় স্থানীয় ইতিহাসের গুরুত্ব এখনো বিশেষ উপলব্ধ হয়নি। তা যেন ইতিহাসের পেছনপটের মতো কিছু একটা। কেন্দ্রীয় ইতিহাসের বাইরে এই যে ইতিহাস তার গুরুত্ব তো নেহায়াত অল্প নয়। হাল আমলে তাকে সাব-অলটার্ন স্টাডিজ হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। আবার ইতিহাস বলতে তো আমরা শুধু রাজনৈতিক ইতিহাসকেই বুঝি। সেখানে সাহিত্যচর্চার ইতিহাস তথা বুদ্ধিবৃত্তিক সাধনার বৃত্তান্ত নিঃসন্দেহে নব সংযোজন। এই গ্রন্থ তুলে ধরেছে আরও বহু গ্রন্থের সম্ভাবনাকে, নিশ্চয় লেখক সেই অবারিত প্রান্তরে ঘুড়ি ওড়িয়ে দেবেনÑ সমাজকে সমৃদ্ধ করে তুলবেন সংস্কৃতির আলোয়Ñসাহিত্যের সুদৃঢ় বুনিয়াদে। মোজাম্মেল বিশ্বাস এই মাটির সন্তানÑ এই অঞ্চলের জল-হাওয়া-মাটির গন্ধে বেড়ে ওঠা। এই লোকসভ্যতার সুর ও স্বর খুব চেনা। তাই এই গ্রন্থরচনা সেই অর্থে তাঁর পক্ষে সহজতর হয়েছে। শুধু সাহিত্য নয়, পুরো দিনাজপুরসত্তাকে ধারণ করেছেন তিনি। তাঁর রচনার দুটি প্রধান বৈশিষ্ট্যÑ তথ্যনিষ্ঠা ও সামগ্রিক দৃষ্টিকোণ। এই দুইয়ের মেলবন্ধন গ্রন্থটিকে দিয়েছে বস্তুনিষ্ঠতার ভিত্তি ও শক্তি। অপরাপর মতের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ তাঁর রচনাকে অভিষিক্ত করেছে সর্বজনীন মর্যাদায়। মোজাম্মেল বিশ্বাস ইতিহাস-ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি-অন্বেষায় ইতোমধ্যে নিষ্ঠার পরিচয় দিয়েছেন। কথায় চিড়া ভেজানোর বিপ্রতীপে দাঁড়িয়ে বর্তমান গ্রন্থটি তাঁর সাহিত্যনিষ্ঠার প্রত্যক্ষ ফসল। সাহিত্যের অধ্যাপক তিনি, চিন্তা করেন সমাজ ও সংস্কৃতি নিয়ে। দেশ-কাল-সমাজের কাছে তার রয়েছে অপার অঙ্গীকার। স্থানীয় সাহিত্যিকরা যে মুক্তির স্বপ্ন দেখেছিলেন নানাবিধ অর্গল ভেঙে, নানান অচলায়তনকে অতিক্রম করে চেয়েছিলেন মনুষ্যত্বের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতে তারই রূপ-রূপান্তর তুলে ধরতে চেয়েছেন লেখক। কালে ও কালান্তরে এই গ্রন্থ তাই স্মরণীয় মূল্য পাবে।
নামদিনাজপুরের সাহিত্যচর্চার ইতিহাস
লেখকমোজাম্মেল বিশ্বাস
প্রকাশনীTangon Prokashon || টাঙ্গন প্রকাশন
ভাষাBengali
সংস্করণ1st Published, 2026
অবস্থাNew
ISBN-139789849455424
মুদ্রণ দেশBangladesh

লেখক পরিচিতি

মোজাম্মেল বিশ্বাস

মোজাম্মেল বিশ্বাস-এর আরও বই ঘুরে দেখুন। এই লেখকের লেখা পাঠকদের কাছে বিশেষভাবে সমাদৃত।

মোজাম্মেল বিশ্বাস-এর সব বই

প্রকাশনী সম্পর্কে

Tangon Prokashon || টাঙ্গন প্রকাশন

Tangon Prokashon || টাঙ্গন প্রকাশন প্রকাশনীর প্রকাশিত বই — মানসম্মত ছাপা, নির্ভরযোগ্য সংস্করণ। এই প্রকাশনীর আরও বই দেখুন।

Tangon Prokashon || টাঙ্গন প্রকাশন-এর সব বই

এখন স্টকে নেই

স্টকে এলে সবার আগে খবর পান

রেটিং ও রিভিউ — দিনাজপুরের সাহিত্যচর্চার ইতিহাস

0

0 রেটিং

5
0
4
0
3
0
2
0
1
0

Loading

Loading